Tuesday 25th of September 2018 09:05:41 PM
 
  Top News:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহারে দ্বিতীয়, তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে----মো:নাসির  |  দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ৫টি সহজ উপায়  |  ৫ মিনিটের কম সময়ে এসিডিটির সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়  |  Beat Diabetes: 4 Ways to Prevent Type 2 Diabetes  |  নারীদের সফলতার পেছনে রয়েছে এই ৩টি কারণ  |  পাঁচ বদভ্যাসে ক্ষুধা নষ্ট  |  এই খাবারগুলো খালি পেটে খাবেন না  |  রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার এ কারণটি জানেন কি?  |  কম খরচে বিদেশ ভ্রমণে এশিয়ার সেরা ৭  |  শুধু ছেলেরাই নয়, মেয়েদেরকেও দিতে হবে প্রেমের প্রস্তাব   |  উৎকৃষ্ট সব অভ্যাস যাতে মেলে সুখ  |  যে ৪টি কারণে মানুষ অজ্ঞান হয়ে যায়  |  মেঘদূত - জেবু নজরুল ইসলাম  |  3 Things Not To Say To Your Toddler  |   Men lose their minds speaking to pretty women  |  Lessons From a Marriage  |  চুইং গামে কী রয়েছে জানেন কি?  |  নিজেই তৈরি করে নিন দারুচিনি দিয়ে মাউথ ওয়াশ  |  সুস্থ থাকুন বৃষ্টি-বাদলায়  |  অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সামলে উঠুন ৪টি উপায়ে  |  
 
 

এক কিংবদন্তির নাম আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

March 19, 2016, 10:41 PM, Hits: 286

 

এনজেবিডি নিউজ : বাংলাদেশের উত্তরে গারো পাহাড়ের কোলে গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে ছোট্ট একটি মফস্বল শহর। ব্রহ্মপুত্রের পলিবিধৌত এই শহরটির নাম ময়মনসিংহ। ময়মনসিংহ শহরকে ডানে রেখে সোজা সমান্তরাল চলে গেছে ব্রহ্মপুত্র। তাঁর আগে শহরে ঢোকার পথে একটি বাঁক নিয়েছে নদীটি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে এই শহরের মুন্সেফ ছিলেন আবদুল জব্বার খান। তাঁর দ্বিতীয় ছেলে সেন্টু ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে পড়েন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রতিদিন বিশাল বিশাল প্রাচীন রেইন্ট্রি গাছের ছায়া আর পাখিদের সুমধুর কলকাকলির ভেতর দিয়ে তিনি স্কুলে যান।

খুব শান্ত মিষ্টি একটি বালক। কোথাও কোনো কোলাহল নেই। সকালে স্কুল আর বিকেলে বাড়ির ছাদে বসে বসে দূরের গারো পাহাড়টাকে দেখার বাসনায় মাথা উঁচিয়ে একমনে ধ্যান করে বসে থাকেন। কোনো কোনো দিন বিকেলে সূর্যাস্তের আগে নদীর তীর ধরে হাঁটতে যান আপন মনে।

অনেকটা পথ হেঁটে এসে নদীটা যেখানে বাঁক নিয়েছে, সেখানে দাঁড়িয়ে থাকেন পশ্চিম দিকে মুখ করে। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে পশ্চিম দিকের অনেকটা দূর পর্যন্ত দেখা যায়। অনেকটা দূরে সূর্য তখন আপন মনে লালিমা ছড়িয়ে নদীর পেটের ভেতর ডুবে যেতে থাকে।

বালক মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকে এই দৃশ্য। মনে মনে প্রার্থনা করে, এই অপূর্ব দৃশ্য যদি আমি চিরজাগরুক করে রাখতে পারতাম! এই দৃশ্য জাগরুক করার আকাঙ্ক্ষা, পাহাড় দেখার বাসনা বালক সেন্টুকে একদিন কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। আর সেদিনের সেই বালকটি হলেন আবদুল জব্বার খানের দ্বিতীয় ছেলে কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। যাঁর ডাক নাম সেন্টু।

১৯৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বাহেরচর-ক্ষুদ্রকাঠি গ্রামে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খানের জন্ম। বাবা আবদুল জব্বার খান ছিলেন বিচারক। হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে তিনি অবসর নেন। পরবর্তীকালে রাজনীতিতে যোগ দেন তিনি এবং পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার হন।

মা সালেহা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। অল্প বয়সে তাঁর মা মারা গেলে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। নতুন মা নিজেকে সৎমা হিসেবে কখনো বুঝতে দেননি তাঁদের। ফলে সহোদর ভাইবোন এবং সৎভাইবোনের কোনো ভেদরেখাও ছিল না তাঁদের সম্পর্কে।

আবু জাফরের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় বাবার কর্মস্থল ময়মনসিংহে। ১৯৪৮ সালে ময়মনসিংহ জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৫০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে এবং ১৯৫৪ সালে অনার্সসহ এমএ পাস করেন।

১৯৫৮ সালে Later Poems of Yeats: The Influence of Upanishads বিষয়ে গবেষণা করেন যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই পরবর্তীকালে উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ে ডিপ্লোমা করেন তিনি।

১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের শুরু তাঁর। তবে পঞ্চাশ দশকের ক্যারিয়ারিস্ট জেনারেশনের চলতি রীতি ধরে ১৯৫৭ সালে তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সকল পরীক্ষার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন।

সিভিল সার্ভেন্ট হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের সচিব পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন পদে কাজ করেন তিনি। ১৯৮২ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের কৃষি ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৪ সালে তিনি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন।

১৯৯১ সালে তিনি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ব্যাংককে FAO কার্যালয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৯৭ সালে FAO থেকে অবসর গ্রহণের সময় তিনি এ প্রতিষ্ঠানের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের মহাপরিচালক ছিলেন।

১৯৯৮ সালে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের চেয়ারম্যান হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন উইনরক ফাউন্ডেশনের সাম্মানিক সদস্য, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স ও জন এফ কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্ট-এর ফেলো।

পঞ্চাশ দশকের অন্যতম কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। তাঁর কবিতায় পাওয়া যায় আবহমান বাংলার অকৃত্রিম ছবি। তাঁর কবিতার সূচনা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে  কেন্দ্র করে।

এর মধ্যে ‘মাগো, ওরা বলে’ কবিতাটি বহুল পঠিত। তবে কবির বিকাশ ঘটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সামগ্রিক জনজীবনের আশা-নিরাশা এবং স্বপ্ন-বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে।

তিনি তাঁর কাব্যরীতিতে মূলত দুটি প্রবণতাকে অনুসরণ করেছেন : একটি তাঁর প্রথম জীবনের প্রিয় গীতিমুখ্য কাব্যরীতি আর অন্যটি মহাকাব্যিক। পঞ্চাশের দশকে রচিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাত নরী হার’ (১৯৫৫) এবং পরবর্তীকালের ‘কখনো রং কখনো সুর’ (১৯৭০) ও ‘কমলের চোখ’ (১৯৭৪)-এ ধরনের গীতিমুখ্য সুললিত কবিতার সংকলন।

আশির দশক থেকে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ মহাকাব্যিক কাব্যরীতিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। এ পর্যায়ে তাঁর কবিতার বিষয় হিসেবে উঠে আসা মা-মাটি ও সংগ্রামী মানুষের চিত্র পরিচিত দেশ-কালের সীমানা অতিক্রম করে স্পর্শ করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল।

এ মহাকাব্যিক কাব্যভঙ্গিতেই তিনি রচনা করেন তাঁর সর্বাধিক জননন্দিত কাব্যগ্রন্থ ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ (১৯৮১)। এ ছাড়া ‘সহিষ্ণু প্রতীক্ষা’ (১৯৮২), ‘প্রেমের কবিতা’ (১৯৮২), ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ (১৯৮৩) কাব্যগ্রন্থ দুটিতেও মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা লক্ষ করা যায়।

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ রচিত অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘আমার সময়’ (১৯৮৭), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (১৯৯১), ‘আমার সকল কথা’ (১৯৯৩), ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ এবং জীবিত অবস্থায় তাঁর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘মসৃণ কৃষ্ণগোলাপ’ (২০০২)।

এ ছাড়া তিনি রচনা করেছেন বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণাধর্মী গ্রন্থ। সেগুলির মধ্যে রয়েছে চীনের কমিউন সম্পর্কে Yellow Sands' Hills: China through Chinese Eyes, বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন সম্পর্কে Rural Development : Problems and Prospects; (Tom Hexner-এর সঙ্গে যৌথভাবে); Creative Development; Food and Faith।

কাব্য রচনার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি লাভ করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৯) ও একুশে পদক (১৯৮৫)।

এ ছাড়া তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘পদাবলি’ নামে কবিদের একটি সংগঠন। সংগঠনটি আশির দশকে দর্শনীর বিনিময়ে কবিতাসন্ধ্যার আয়োজন করত। দীর্ঘ এক বছর অসুস্থ থাকার পর ২০০১ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই অমর কবি।