Saturday 16th of December 2017 07:36:03 PM
 
  Top News:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহারে দ্বিতীয়, তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে----মো:নাসির  |  দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ৫টি সহজ উপায়  |  ৫ মিনিটের কম সময়ে এসিডিটির সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়  |  Beat Diabetes: 4 Ways to Prevent Type 2 Diabetes  |  নারীদের সফলতার পেছনে রয়েছে এই ৩টি কারণ  |  পাঁচ বদভ্যাসে ক্ষুধা নষ্ট  |  এই খাবারগুলো খালি পেটে খাবেন না  |  রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার এ কারণটি জানেন কি?  |  কম খরচে বিদেশ ভ্রমণে এশিয়ার সেরা ৭  |  শুধু ছেলেরাই নয়, মেয়েদেরকেও দিতে হবে প্রেমের প্রস্তাব   |  উৎকৃষ্ট সব অভ্যাস যাতে মেলে সুখ  |  যে ৪টি কারণে মানুষ অজ্ঞান হয়ে যায়  |  মেঘদূত - জেবু নজরুল ইসলাম  |  3 Things Not To Say To Your Toddler  |   Men lose their minds speaking to pretty women  |  Lessons From a Marriage  |  চুইং গামে কী রয়েছে জানেন কি?  |  নিজেই তৈরি করে নিন দারুচিনি দিয়ে মাউথ ওয়াশ  |  সুস্থ থাকুন বৃষ্টি-বাদলায়  |  অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সামলে উঠুন ৪টি উপায়ে  |  
 
 

বহুদলীয় গনতন্ত্রের প্রবর্তক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান - ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম

May 30, 2016, 8:49 PM, Hits: 382

 


৩০মে‬ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৩৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী। বহুদলীয় গনতন্ত্রের প্রবর্তক শহীদ জিয়া ছিলেন বাংলার আকাশের সবচেয়ে উজ্জল নক্ষত্র। ১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে তিনি নিহত হন।শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নাম বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ক্ষনজন্মা রাষ্ট্রনায়ক। নানা কারণে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে স্থান করে নিয়েছেন। তার সততা, নিষ্ঠা, গভীর দেশপ্রেম,পরিশ্রমপ্রিয়তা, নেতৃত্বের দৃঢ়তা প্রভৃতি গুণাবলি এ দেশের গণমানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছিল। তিনি ছিলেন একজন পেশাদার সৈনিক। তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কাছে তার যে গ্রহণযোগ্যতা ছিল অন্য কোনো রাষ্ট্রনায়কের ভাগ্যে তা জোটেনি। মাত্র ছয় বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। কিন্তু সাধারণ মানুষ তার ওপর ছিল প্রচণ্ড আস্থাশীল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার ওপর মানুষের এই আস্থায় কোনো চিড় ধরেনি।

একজন জিয়াউর রহমান যদি বার বার এদেশে ফিরে আসতো!!!!!!! আজকের বাংলাদেশের যে টুকু অর্জন সেতো এই মহান নেতার দূরদর্শী নেতৃত্বের হাত ধরে। তলা বিহীন ঝুড়ি থেকে সবুজ বিপ্লবের বাংলাদেশ। স্বপ্নদ্রষ্টা তো একজনই যার নাম জিয়া। মা বাবার আদরের কমল। সেদিন জিয়া মরেনি..মরে গিয়েছিল একটি বাংলাদেশ। এই ক্রান্তিকালে জিয়ার মত নেতার বড্ড বেশী প্রয়োজন। আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে, লোভের উর্ধে উঠা এক রাষ্ট্রনায়ক-যাকে বলি বাংলার রাখা রাজা। অহংকার না থাকা একজন জিয়াই দেখিয়েছেন কিভাবে মাটির মানুষ হওয়া যায়, কিভাবে সর্বস্ব দিয়ে দেশকে ভালোবাসা যায়।মাটির সাথে, মানুষের সাথে সম্পর্ক থাকলে জিয়ার মতো সাফারী পড়েই মাটিতে বসে পরা যায়।

জাতির বর্তমান দুর্বিসহ ক্রান্তিকালে মেজর জিয়ার মতো একজন কালজয়ী বহুদলীয় গণতন্ত্রের কান্ডারীর নিরন্তর প্রয়োজন। জিয়াউর রহমানের কর্ম ও আদর্শকে ধারণ করে আছে তার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। তার মৃত্যুদিনে আনুষ্ঠানিকতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তার রাজনীতির অনুসরণ। বিএনপির বর্তমান তরুণ শক্তিকে জানতে ও উপলব্ধি করতে হবে, কেন জিয়াউর রহমান এদেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে আসন গেড়েছেন। এই উপলব্ধিই বিএনপিকে শক্তি অর্জনে সাহায্য করবে।

মাত্র তিনি বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে তিনি দেশের কৃষি, শিক্ষা, শিল্পসহ সকল ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ দুর্ভিক্ষের রাষ্ট্র থেকে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জন করে। শিল্প ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের গোড়াপত্তন করেন। বৈদেশিক যোগাযোগ ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনি দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে সার্ক গঠন করেছিলেন। দেশ ও জাতি গঠনে জিয়াউর রহমানের এসব অবদানের কারণেই তিনি জাতির মধ্যে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। মিশে থাকবেন এ জাতির সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গে।

প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ
জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ
বাংলাদেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ...!

অসীম সাহসী জাতিকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন একজন অসম সাহসী নেতার।

জিয়াউর রহমান আজ বেঁচে নেই, কিন্তু আছে তার রেখে যাওয়া ১৯ দফা কর্মসূচি, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দর্শন, তার সততা, দেশপ্রেম, জনগণের ভালোবাসা, তার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি। আরও আছে তার যোগ্য উত্তরসূরি ও তার সহধর্মিণী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন, জনগণের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই আগামী দিনে দেশপ্রেমিক জিয়ার সব আদর্শ, ভাবনা, চিন্তা ও উদ্দেশ্যের বাস্তবায়ন হবে। বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে যা শহীদ জিয়ার স্বপ্ন ছিল।শহীদ জিয়া, শুধু একটি নাম নয়- একটি আদর্শ, একটি অনুপ্রেরণা, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রতীক।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্য ও প্রগতির মধ্যে এক ধরনের ঐকতানের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে কিছুসংখ্যক কর্মীর মধ্যে যে ভীতি এবং ক্রোধের সৃষ্টি হয়েছিল তা বিএনপির ঐতিহ্য ও আদর্শের বিপরীতে তাড়িত করেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির নেতৃত্বের ওপর দুটি বড় দায়িত্ব। ১. দলকে সাংগঠনিকভাবে মজবুত করে গড়ে তোলা ২. দেশের জনগণকে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে সাহায্য করা।
 
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ। রক্তপিপাসু পাক হানাদার বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙ্গালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে - বাঙালি জাতি যখন বর্বরোচিত ও নজিরবিহীন হামলা ও রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনার অভাবে কিংকর্তব্যবিমূঢ় - ঠিক তখন জাতির ত্রাতা হিসেবে আবির্ভাব ঘটে মেজর জিয়ার।
অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান ২৫শে মার্চ রাতে পাদপ্রদীপের আলোয় চলে আসেন। চট্টগ্রাম বন্দরে ‘সোয়াত’ জাহাজ থেকে গোলাবারুদ খালাস করার জন্য রেজিমেন্টের অধিনায়ক লে. কর্নেল আবদুর রশিদ জানজুয়া ক্যাপ্টেন চৌধুরী খালেকুজ্জামানকে আদেশ দেন। পরে মত বদলে জিয়াকে বন্দরে যেতে বলেন। খালেকুজ্জামানের বর্ণনা মতে:
জানজুয়া বলেন, ‘জিয়া ইউ গো ফার্স্ট। খালিক উইল পলো ইউ।’ আমাকে অনেকে প্রশ্ন করেছে, হোয়াই ডিড হি এগ্রি টু গো? হাসির খবর এটা। আর্মিতে ট্রুপস হ্যাভ টু ওভে, ইউ ক্যান্ট রিফিউজ। জিয়া গাড়িতে উঠলেন। সঙ্গে দুজন অফিসার, সে. লে. হুমায়ুন এবং সে. লে. আজম। আমি ওপাশে গেলাম। জিয়া বললেন, খালেকুজ্জামান, কিছু শুনলে জানিও। দ্যাট ওয়াজ অ্যা মেসেজ ফ্রম আল্লাহ থ্রু হিম। গাড়ি চলে গেল। জানজুয়া বাসায় চলে গেলেন, আলহামরা বিল্ডিংয়ে। শওকত চলে গেলেন। ওলি চলে গেল ওপরে। আমি এখন চিন্তায় পড়ে গেলাম। তখন ওলি ওপর থেকে বলল, স্যার, আপনার একটা ফোন আসছে। আমি গেলাম। বাই দ্যাট টাইম ওলি হ্যাজ টক্ড। ফোনে ছিলেন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অব স্ট্যান্ডার্ড ব্যাক আবদুল কাদের। খুব ¯েহ করতেন আমাকে, চাচার মত। বললেন, ‘ঢাকায় তো ইপিআরের ওখানে ফায়ারিং শুরু হয়ে গেছে। আর্মি হ্যাজ রেইডেড দ্য ক্যাম্পস। তোমরা কী করছ।’ আরও কিছু বললেন, আমাকে এক্সাইটেড করলেন। আমি ওলিকে বললাম, আই অ্যাম গোয়িং টু গেট ব্যাক আওয়ার বস জিয়া। দিস ইজ, আল্লাহ হ্যাজ ইনফিউজড সামথিং ইন মি।
পিকআপ আসলো। রাস্তায় ব্যারিকেড। দেওয়ানহাট ওভারব্রিজের সামনে, ওখানে আল্লাহর রহমতে ওইটা (ব্যারিকেড) ছিল। জিয়া, লাইক এ ড্যান্ডি ম্যান, স্মার্ট, হাতে ফিল্টার উইলস, দ্যাট ফেমাস উইলস। সিগারেট খাচ্ছে। বললেন, ‘ইয়েস খালিক, হোয়াট হ্যাপেন্ড?’ আই সেইড, ফঅয়ারিং হ্যাজ স্টার্টেড। ইউপআর ক্যাম্প হ্যাজ বিন অ্যাটাকড, ব্লা ব্লা ব্লা। উনি তখন চিন্তা করলেন। ‘খালিকুজ্জামান, খালিকুজ্জ¥ান’। উনি শাউট করলে আমি আস্তে কথা বলি। সেম টোনে বলি না। বললাম, স্যার স্যার।
জিয়া: হোয়াট শ্যাল উই ডু?
আমি: ইউ নো বেটার।
জিয়া: ইন দ্যাট কেইস উই রিভোল্ট অ্যান্ড শো আওয়ার এলিজিয়েন্স টু দ্য গর্ভর্নমেন্ট অব বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের তখন কোন খবর নাই। লিডার হ্যাজ টু টেক লিডারশিপ। ফিরে এসে...হুমায়ুন আর আজম গাড়িতে বসা ছিল। তাদের কোয়াটার গার্ডে নেওয়া হলো। দে অয়্যার স্টান্ট। জিয়া বললেন, ‘খালিক লেট মি গো অ্যান্ড গেট দিজ বাস্টার্ড (জানজুয়া)।
২৫ মার্চের মধ্যরাতে জিয়ার নেতৃত্বে অষ্টম বেঙ্গলের বাঙ্গালি সদস্যরা বিদ্রোহ করলেন। এর আগে জিয়া সবার কাছে আনুগত্য চেয়েছিলেন। মেজর শওকতকে জিয়া ঘুম থেকে ডেকে তুলেছিলেন। ইউনিট লাইনে তিনি শওকতকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আই হোপ, ইউ আর উইথ আস?....ইট ইজ বেটার টু সেটল দ্য ডিল বিফোর উই আর ইন অ্যা নিরিয়াস গেম।
ওখানে কনফিউশন, কেউ কিছু বলে না।
খালেকুজ্জামান শওকতকে বলেছিলেন, ‘স্যার বলেন না মেজনর জিয়া টু আই সি উইল টেক ওভার লিডারশিপ?’
শওকত বললেন, ‘ভাইসব, আপনারা শোনেন, এখন এখন টু আইসি সাহেব কিছু বলবেন।’
খালেকুজ্জামানের বর্ণনা অনুযায়ী: ‘ এ লিডার মাস্ট বি সিন অ্যান্ড হার্ড। খালি পর্দার পেছন থেকে লিডার যদি বলে, ইফেক্ট ইজ নটদ্য সেম। ড্রামটা ফেলে দিলাম। জিয়া তো মানুষ ছোটখাটো। ওনাকে কেউ ধরে টরে ওপরে দাঁড় করিয়ে দিল। দেন হি কুড স্ট্যান্ড। ইট ইজ অ্যা ফ্যাক্ট দ্যাট হি ডেলিভার্ড। ইউ আর বিইং লেড। ওয়ান হু ইজ বিইং লেড, তার অত চিন্তা আসে না। লিডার টেকস দ্য রেসপনসিবিলিটি। লিডারের চিন্তা বেশি। সো হি ওয়াজ অ্যাংগশাস।
একটা চরম মুহূর্তে জিয়াউর রহমান সিদ্ধান্তটি নিতে পেরেছিলেন। তার সঙ্গে সঙ্গে মেজর মীর শওকত আলী, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান, ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ, ক্যাপ্টেন সাদেক হোসেন, লে. শমসের মবিন চৌধুরী, লে. মাহফুজুর রহমান এবং অষ্টম বেঙ্গলের অন্যান্য বাঙ্গালি সদস্যরা ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন।
জিয়াউর রহমান সেনানায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়েছিলেন। বিএনপি নামের একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি, যা টিকে আছে আজও। তার নেতেৃত্বের স্ফুরণ ঘটেছিলো ১৯৭১ সালেই, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে। তার উত্থান ছিল নাটকীয়তায় ভরা। মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘বিএনপি সময়-অসময়’ শীর্ষক বইয়ে এসব কথা লিখেছেন।




কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে ২৭শে মার্চ  তার দেয়া স্বাধীনতার ঘোষনা পাঠ  ঘুরে দাঁড়ায় একটি পলায়নপর জাতি, দেশের সর্বত্র গড়ে তোলে প্রতিরোধ।
জিয়াউর রহমান থেকে যান যুদ্ধের ময়দানে। তার নেতৃত্বে তৈরী হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম সনাতনী বিগ্রেড - "জেড ফোর্স"।
রণক্ষেত্রে অভূতপূর্ব বীরত্ব প্রদর্শনের স্বীকৃতি স্বরূপ জিয়াউর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের জীবিত যোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান "বীর উত্তম" উপাধিতে ভুষিত করা হয়।


রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের নজিরবিহীন ত্যাগ-তিতিক্ষার পরেও গণতন্ত্র, উন্নয়ন, ভিন্ন মত ও পথের পরিবর্তে একদলীয় বাকশাল কায়েম করা হলে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেন।
জিয়ার হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি। উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতির ধারক ও বাহক এ দলের মাধ্যমে উন্মেষ ঘটে অগ্রগতি, অভিযাত্রা ও আধুনিকায়নে সমৃদ্ধ এক নতুন বাংলাদেশের।
জিয়া ছুটে যান দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কখনো জাল হাতে নদীতে নেমে পড়েন। কখনো মাঠে ফসল আবাদ করেন। কখনো খাল খননে হাতে কোদাল তুলে নেন। আবার কখনোবা কোমলমতি শিশুদের সাথে বই হাতে বসে পড়েন।
 
মুহাম্মদ মনসুর রহমান ও জাহানারা খাতুনের দ্বিতীয় পুত্র শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে ১৯ জানুয়ারী বগুড়া জেলার বাগাবাড়ী গ্রামে তাঁর পিতামহের বসত বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মনসুর রহমান একজন রসায়নবিদ হিসেবে কলকাতাতে সরকারী চাকুরী করতেন। তাঁর শিশুকাল এবং শৈশবের প্রথম অধ্যায় কেটেছে এই বাগাবাড়ি গ্রামেই।
মানুষের জীবনের সমচেয়ে গুরুত্বপূর্ন সময় হলো তার শিশুকাল বা ছেলেবেলা। কারন এই সময়টা হলো নিজেকে আবিস্কার করার এবং প্রকৃতির ভেতর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সময়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও এর ব্যতিক্রম নন।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ডাকনাম ছিল কমল। মাতা-পিতা তখন আদর করে নাম রাখেন কমল। কমল অর্থ পদ্ম। পিতা মুহাম্মদ মনসুর রহমান এবং মাতা জাহানারা খাতুনের বড় আদরের সন্তান ছিলেন এই কমল। তাঁরা হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁদের এই সন্তান পদ্মের মতো বিকশিত হয়ে উঠবে আপন গুন, গরিমা ও প্রতিভায়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অসম্ভাবিতভাবে তাঁর পিতা মুহাম্মদ মনসুর রহমান এবং মাতা জাহানারা খাতুনের নিবিড় পরিচর্যায় বড় হয়ে উঠলেও তার সাথে তাঁর পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিন মন্ডল এবং তাঁর মাতামহী রহিমা খাতুনের প্রত্যক্ষ প্রভাব শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উপর লক্ষ্য করা যায়। আর তাঁর মাতামহ আবুল কাশেম আহম্মেদ এবং তাঁর পিতামহী মিসির উন্নিসা বেগম এবং তাঁর চাচা ডা: মমতাজুর রহমানের পরোক্ষ প্রভাবও তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে দেখা যায়।

ধার্মিক এবং ব্যাক্তিত্ববান পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিনের সাহচার্যে কাটে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মধুর শিশুকাল। দ্বিতীয়ত তাঁর মাতামহী রহিমা খাতুনের প্রভাব ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। কারন তিনি বহু বিরল গুনের অধিকারিনী ছিলেন। তিনি ছিলেন তেহস্বিনী মহিলা, সংগীত চর্চা করতেন। শিক্ষা এবং সাহিত্যের প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ আগ্রহ এবং অনুরাগ। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মাতা জাহানারা খাতুনের সংগীত গুরু ছিলেন শহীদ জিয়ার মাতামহী। জিয়াউর রহমানের মা জাহানারা খাতুন রানী গায়িকা হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। করাচি বেতারে নিয়মিত নজরুলসংগীত গাইতেন তিনি। নজরুলগীতি ও গজল পরিবেশন করতেন তিনি। ক্লাসিক্যাল গানও করতেন। জিয়াউর রহমানের বড় ভাই রেজাউর রহমান আইএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর নৌবাহিনীতে ক্যাডেট অফিসার পদে যোগদান করেন। কয়েক বছর নৌবাহিনীতে থাকার পর ইস্তফা দিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ইংল্যান্ড যান। সেখান থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্র্যাজুয়েশনের পর উচ্চপদের চাকরিতে নিযুক্ত হন। এরপর জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থায়, ইন্টারন্যাশনাল সিভিল অ্যাভিয়েশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় উচ্চতর পদে কাজ করেন। অবসরগ্রহণের পর তিনি ঢাকায় মারা যান। মনসুর রহমানের তৃতীয় ছেলে ও জিয়াউর রহমানের পিঠাপিঠি কনিষ্ঠ ভাই মিজানুর রহমান অর্থনীতিতে মাস্টার ডিগ্রি লাভের পর ব্যাংকিং সার্ভিসে যোগদান করেন। আরব বাংলাদেশ ব্যাংকের লন্ডন শাখার পরিচালক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ১৯৯৮ সালে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। জিয়াউর রহমানের চতুর্থ ভাই খলিলুর রহমান ফার্মেসিতে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভের পর জাম্বিয়া সরকারের অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন। তিনিও বেঁচে নেই। তার পরিবার যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিল্যান্ডে বসবাস করে। জিয়াউর রহমানের কনিষ্ঠ ভাই আহমেদ কামালও একজন গ্র্যাজুয়েট। তিনি পর্যটন করপোরেশনের জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন। তিনি অবিবাহিত। ঢাকায় বসবাস করছেন।

জিয়াউর রহমানের পিতৃবংশীয় পূর্বপুরুষেরা কয়েক শতাব্দী আগে বগুড়া জেলার গাবতলী থানার মহিষাবান গ্রামে বসতি স্থাপন করেছিলেন বলে জানা যায়। তাদের ‘মণ্ডল’ পদবি থেকে অনুমিত হয়, পরিবারের প্রবীণ ব্যক্তিরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ছিলেন। জিয়াউর রহমানের পারিবারিক বংশতালিকা অনুসন্ধানে জানা যায়, মণ্ডল পরিবারের আদি পুরুষদের মধ্যে মুমিন উদ্দিন মণ্ডল ছিলেন গাবতলী, সুখানপুকুর ও যমুনার পশ্চিম তীরবর্তী এলাকার একজন প্রভাবশালী নেতা। তার তৃতীয় অধস্তন বংশধর ছিলেন কাকর মণ্ডল। তিনিও এই অঞ্চলের একজন স্বনামখ্যাত নেতা ছিলেন। তিনি জিয়াউর রহমানের প্রপিতামহ। কাকর মণ্ডলের একমাত্র ছেলে কামালউদ্দিন মণ্ডল ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষাবিদ। তিনি জিয়াউর রহমানের পিতামহ। শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকার জন্য এলাকায় আজও তিনি প্রশংসিত। গাবতলী থানার বাগবাড়ি গ্রামের এক প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী পরিবারের ধনাঢ্য উত্তরসূরি করিম বখশ তালুকদারের কন্যা মিসিরউন্নিসা বেগমের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন কামালউদ্দিন মণ্ডল। করিম বখশ তালুকদারের কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। একমাত্র কন্যা মিসিরউন্নিসাই তার সব জোত-জমির উত্তরাধিকারী ছিলেন। করিম বখশ তালুকদারও শিক্ষানুরাগী ও সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য সুখ্যাতি অর্জন করেন। বিয়ের পর কামালউদ্দিন বাগবাড়ি মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘকাল কর্মরত ছিলেন। তিনি কামাল পণ্ডিত হিসেবে এলাকায় পরিচিত। মণ্ডল পরিবারের লোকেরা সে সময়কার দুদু মিয়ার নেতৃত্বাধীন কৃষক অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছিলেন বলে জানা যায়। জিয়াউর রহমানের পিতামহ কামালউদ্দিন মণ্ডল বাগবাড়িতে ৩০ বছর শিক্ষকতার পর স্বগ্রাম মহিষাবানে ফিরে গিয়ে এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের কাজে ব্রতী হন। তিনি একটি প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। পরে এ স্কুলটি হাইস্কুলে উন্নীত হয়। এ স্কুলে তার নামে একটি চেয়ার আজও সংরক্ষিত। কামালউদ্দিন ব্রিটিশ যুগে পর পর দুবার ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। জিয়াউর রহমানের মাতামহী মিসিরউন্নিসা বেগমও তার সম্পত্তির এক বিরাট অংশ সমাজ উন্নয়ন ও শিক্ষা বিস্তারের কাজে ব্যয় করে যান। কামালউদ্দিন মণ্ডলের প্রথম দুই ছেলে মাইনর পাসের পর সাংসারিক কাজে নিয়োজিত হন। তৃতীয় ছেলে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। চতুর্থ ছেলে মুহম্মদ মুয়াজ্জেম উদ্দিন কলকাতার শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি লাভের পর প্রকৌশলী হিসেবে বিভিন্ন উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হন। পঞ্চম ছেলে রসায়নবিজ্ঞানী মুহম্মদ মনসুর রহমানই ছিলেন জিয়াউর রহমানের বাবা। কামালউদ্দিন ও মিসিরউন্নিসার ষষ্ঠ ছেলে মুহম্মদ মমতাজুর রহমান কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভের পর সেনাবাহিনীতে কমিশন পেয়ে চিকিৎসক পদে যোগদান করেন। তাদের সপ্তম ছেলে মাহফুজুর রহমান বিএসসি ডিগ্রি লাভের পর চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেসি প্রথম পার্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আয়কর আইনজীবী পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। জিয়াউর রহমানের মাতৃকুলের লোকেরা বৈবাহিক সূত্রে পঞ্চগড় জেলার অটোয়ারির মির্জা বংশের সঙ্গে পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। জিয়াউর রহমানের মাতামহ আবুল কাসেমদের চা-বাগান ছিল। সে জন্য তাদের বলা হতো ‘টি ফ্যামিলি’। তার সঙ্গে বিয়ে হয় বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য মির্জা কাদের বখশের বোনের মেয়ে রহিমা খাতুনের। তিনি ছিলেন জিয়াউর রহমানের আপন মাতামহী।

শহীদ জিয়া গভীর আগ্রহ নিয়ে সারাদিন পরিশ্রম করে ক্লান্ত হয়ে বাড়ী ফিরলেও খাওয়া দাওয়ার পর বিছনায় যেয়ে এই সংগীতের প্রতি অনুরক্ত হতে ভুলতেন না। সেই ছোট বেলা থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এই অভ্যাস বিদ্যমান ছিল।

ছোটবেলায় শহীদ জিয়া খুব খেলাধুলা করতেন। ফুটবল, হকি ও ক্রিকেট ছিলো শহীদ জিয়ার প্রিয় খেলা। মাঝেমধ্যে গুলি, ডান্ডাও খেলতেন। আবার কখনো কখনো বৃষ্টিতে ভিজতেন কাঁদা মেখে আনন্দ পেতেন। কখনো কখনো আকাশে ঘুড়ি উড়াতেন। খেলাধুলায় মেতে থাকলেও সন্ধ্যায় রাস্তায় বাতি জ্বলে ওঠার সাথে সাথে বাড়ী ফিরে যেতেন শহীদ জিয়া। এরপর লেখা পড়ায় মনোনিবেশ করতেন তিনি। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে যাওয়া শহীদ জিয়ার ছোট বেলা অভ্যাস ছিল। স্বল্পভাষী হলেও ছেলেবেলায় ও শহীদ জিয়া ছিলেন প্রানবন্ত।

চকলেট তাঁর খুব প্রিয় ছিল ছোট বেলায়। পছন্দ করতেন মিষ্টি ও মুরগির গোশত। বিশেষ করে মুরগির পাখনাকে শহীদ জিয়া শিশু কালে নাম দিয়েছিলেন লাঙল। আর প্রিয় খাবার ছিল ভাজা বাসী ভাত বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষায় যাকে বলা হয় ‘কড়কড়া’।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বয়স যখন ৪ বৎসর তখন থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে যাতায়াত শুরু করেন। এই সালটি ছিল ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ। কারন শহীদ জিয়ার পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিন মন্ডল স্কুলে অর্থাৎ যে স্কুলে শহীদ জিয়ার হাতে খঁড়ি সেই বাগাবাড়ি মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। শহীদ জিয়ার হাতে খড়ি হয় তারই পিতামহের হাতে। বাগাবাড়িতে তিনি ছিলেন ছোট কমলের প্রথম শিক্ষা গুরু।

সেই সূত্রে জিয়াউর রহমানের সৌভাগ্য যে তিনি তার পিতামহের কাছ থেকে জীবনের বিভিন্ন বিষয় ও বস্তুনিষ্ট মূল্যায়ন করতে শিখেছিলেন। এরপর ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর পিতা মুহাম্মদ মনসুর রহমান তাঁর পরিবারকে কোলকাতায় নিয়ে যান। তখন শহীদ জিয়ার বয়স ৬ বছর। তাঁকে ভর্তি করা হয় পার্ক সার্কাসের আমীন আলী এভিনিউতে অবস্থিত শিশু বিদ্যাপীঠে।

এক বছর এই স্কুলে তিনি পড়াশুনা করার পর আবার নিজ গ্রাম বগুড়ার বাগবাড়িতে ফিরে যায় তার পরিবার। বগুড়ার বাগবাড়ী গ্রামে পিতামহের বসত বাড়ীতে শহীদ জিয়ার আর একটি বছর কাটে। আবার বাগবাড়ি মাইনর স্কুলে এক বছররের জন্যে ভর্তি হন শহীদ জিয়া।

এরপর শহীদ জিয়ার পরিবার আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। শুরু হয় নতুন উদ্দীপনায় আবার এক নতুন জীবন চলা। সালটি ছিল ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দ। শহীদ জিয়াকে তখন কলকাতায় কলেজ স্ট্রীটের হেয়ার স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করে দেওয়া হয়। সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত শহীদ জিয়া হেয়ার স্কুলেই লেখাপড়া করেন।

১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পর শহীদ জিয়ার পিতা মো: মনসুর রহমানের সরকারী চাকরী সূত্রে পরিবার পরিজন নিয়ে পাকিস্তানের করাচীতে চলে আসেন। শহীদ জিয়াকে ১৯৪৮ এর ১ জুলাই ভর্তি করে দেয়া হয় করাচী একাডেমী স্কুলে সপ্তম শ্রেনীতে। বর্তমানে সেই স্কুলের নাম তাইয়ের আলী আলভী একাডেমী। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যোগদান করেন পাকিস্তান সামরিক একাডেমীতে একজন অফিসার ক্যাডেট হিসেবে। শুরু হয় তার জীবন সংগ্রামের নতুন অধ্যায়।

জীবনের শুরু থেকেই একটি নৈতিক একটি আদার্শিক কঠিন বাতাবরন চিন্তা ও দর্শনের উপর টিকে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে জীবন শুরু শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত— সেই জীবন দর্শন থেকে একটি মুহূর্তের জন্যও বিচ্যুত হননি তিনি।

১৯৫২ সালে তিনি দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন করাচিতে ‘করাচি একাডেমি স্কুল’ (বর্তমানে, তাইয়েব আলী আলভী একাডেমী) থেকে। ম্যাট্রিক পাসের পর তিনি ভর্তি হন করাচির ‘ডি জে কলেজে’। ১৯৫৩ সালে ‘পাকিস্তান সামরিক একাডেমি’তে একজন অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন।

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে একজন কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে বীরত্ব দেখিয়ে জিয়াউর রহমান পাক সেনাবাহিনীতে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন। এ সময়েই জিয়াউর রহমান বাঙালি সহকর্মীদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর তাকে পাকিস্তান সামরিক একাডেমীতে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব দেয়া হয়। সেখানেও তিনি নবীন সেনা অফিসারদের সঙ্গে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ বিষয়ে কথা বলেছেন।
এদিকে, ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পূর্ব-পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতা প্রাপ্তির সুযোগ পায় পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। জাতীয় পরিষদের ১৬২ আসনের মধ্যে ১৬০টি ও প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে।
এই বিশাল বিজয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের ক্ষমতা গ্রহণের অপেক্ষায় ছিলেন। অন্যদিকে, পাকিস্তান পিপলস্ পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এ নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত কম আসনে জয় পেয়েও ক্ষমতা ভাগাভাগির নানা কৌশল আটতে থাকেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানও এ অপকৌশলে সহায়ক ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘ বিলম্বের পর ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। কিন্তু, কোনো কারণ ছাড়াই হঠাত্ ১ মার্চ দুপুরে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন তিনি।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ফুঁসে ওঠে পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ। ১ মার্চ থেকেই রাজপথে নেমে আসেন তারা। ২ মার্চ উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা। শাসকগোষ্ঠীর কারফিউ ভেঙে দিন-রাত চলে বিক্ষোভ। বিক্ষোভে নির্বিচারে গুলিতে নিহত হয় অন্তত তিনজন। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান এদিন এক বিবৃতিতে ৩ মার্চ থেকে ৬ মার্চ প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত গোটা প্রদেশে হরতালের ডাক দেন।
২ মার্চ থেকে ৫ মার্চ দেশজুড়ে সংঘর্ষ চলে। বহু মানুষ হতাহত হন। ৬ মার্চ দুপুর ১টা ৫ মিনিটে রেডিও পাকিস্তানের জাতীয় অনুষ্ঠানে ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন আহ্বান করেন।
পরের দিন ঐতিহাসিক ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান কী ভাষণ দেবেন তা শোনার জন্য সারাদেশ ও আন্তর্জাতিক মহল অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। ৭ মার্চ শেখ মুজিব বজ্রকণ্ঠে সাত দফা ঘোষণা করেন। সামরিক আইন ও সেনা বাহিনী প্রত্যাহার, গণহত্যার তদন্ত এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের প্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করা হইলে পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের প্রশ্ন বিবেচনা করা যাইতে পারে, তাহার পূর্বে নয়।’ সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমানের লেখা ‘বাংলাদেশের তারিখ’ (প্রথম সংস্করণ) নামক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে—“বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘জয়-বাংলা, জয় পাকিস্তান’ বলে ৭ মার্চের ভাষণ শেষ করেন।”
৯ মার্চ মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পল্টনের এক জনসভায় শেখ মুজিবকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী অপেক্ষা বাংলার নায়ক হওয়া অনেক গৌরবের।’ (দৈনিক আজাদ, ১০ মার্চ ১৯৭১) ১০ মার্চ একইভাবে তিনি বলেন, ‘আলোচনায় কিছু হবে না। ওদের আসসালামু আলাইকুম জানিয়ে দাও।’
১৩ মার্চ ভৈরবে এক জনসভায় ভাসানী বলেন, ‘পূর্ববাংলা এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং আমরা এখন একটি পূর্ববাংলা সরকারের অপেক্ষায় আছি।’ ১৪ মার্চ জনতার বাঁধভাঙা আন্দোলনের একপর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান ওয়ালী খানের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেন।
শাসনতান্ত্রিক সংকট প্রশ্নে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনার জন্য ১৫ মার্চ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও প্রেসিডেন্ট জেনারেল আবু মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। ১৬ মার্চ প্রথম শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান বৈঠকে বসেন।
১৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের দ্বিতীয় দফা সংলাপও সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়। ১৮ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের বিরতি ছিল। ১৯ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের মধ্যে তৃতীয় দফা বৈঠক হয়। বৈঠকের পর শেখ মুজিব সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি মঙ্গলের প্রত্যাশী, আবার চরম পরিণতির জন্যও প্রস্তুত।’ ২০ মার্চ বৈঠকের পর আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান তিনি।
২১ মার্চ পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় আসেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পৃথকভাবে শেখ মুজিবুর রহমান ও ভুট্টোর সঙ্গে বৈঠক করেন। রাজনৈতিক সঙ্কট উত্তরণে ২২ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর পূর্ব ঘোষিত ২৫ মার্চের জাতীয় পরিষদের সভা স্থগিত করা হয়।
দীর্ঘ আলোচনার পর ২৪ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সমঝোতার আভাস দেন। সংবাদ সম্মেলনে শেখ মুজিব বলেন, ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে আমরা মতৈক্যে পৌঁছেছি। আমি আশা করি, প্রেসিডেন্ট এখন তা ঘোষণা করবেন।’
২৫ মার্চ দিনব্যাপী ঢাকা শহরে চলে প্রতিবাদ মিছিল, রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি এবং বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ চলে সংগ্রামী মানুষের সঙ্গে সেনাবাহিনীর জওয়ানদের। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। এ দিন রাত ১১টার পর থেকে অপারেশন সার্চ লাইট শুরু করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। পাকবাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা, ইপিআর সদর দফতর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো ঢাকা মহানগরীতে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং অগ্নিসংযোগ করে।
রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে একটি ট্যাংক, একটি সাঁজোয়া গাড়ি এবং কয়েকটি ট্রাক বোঝাই সৈন্য শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির ওপর দিয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে রাস্তা ধরে এগিয়ে আসে এবং তাকে সহ ৪ জন চাকর এবং একজন দেহরক্ষীকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের আগেই শেখ মুজিবুর রহমান গণহত্যার প্রতিবাদ এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবিতে ২৭ মার্চ সারাদেশে হরতাল আহ্বান করেন। পরের দিন শেখ মুজিবের গ্রেফতার ও হরতালের খবর প্রায় সব পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
এদিকে রাত আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিটের দিকে চট্টগ্রাম থেকে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন মেজর জিয়াউর রহমান। এর আগে দিনে চট্টগ্রাম শহরে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করে। অস্ত্র বোঝাই জাহাজ সোয়াতের বিরুদ্ধে গড়ে তোলা হয় প্রবল প্রতিরোধ। অস্ত্র খালাস করে যাতে পশ্চিমা সৈন্যদের হাতে না পৌঁছতে পারে সে জন্য রাস্তায় রাস্তায় তৈরি করা হয় ব্যারিকেড। এই ব্যারিকেড সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কারের কাজে লাগানো হয় বাঙালি সৈন্যদের। রাত ১০টা পর্যন্ত চলে এই ব্যারিকেড সরানোর কাজ। রাত ১১টায় চট্টগ্রামস্থ অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’র কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল আবদুর রশীদ জানজুয়া আকস্মিকভাবে সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমানের কাছে নির্দেশ পাঠান এক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে বন্দরে যাওয়ার জন্য।
রাত প্রায় সাড়ে ১১টায় জানজুয়া নিজে এসে মেজর জিয়াকে নৌ-বাহিনীর একটি ট্রাকে তুলে ষোলশহর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বন্দরের দিকে রওনা করিয়ে দেন। সঙ্গে একজন নৌ বাহিনীর অফিসারকে (পশ্চিম পাকিস্তানি) গার্ড হিসেবে দেয়া হয়। রাস্তায় বিভিন্ন জায়গায় ব্যারিকেড সরিয়ে যেতে তাঁর দেরি হয়। আগ্রাবাদে একটা বড় ব্যারিকেডের সামনে বাধা পেয়ে তাঁর ট্রাক থেমে যায়, তখনই পেছন থেকে একটি ডজ গাড়িতে ছুটে আসেন ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান। গাড়ি থেকে নেমেই তিনি দৌড়ে যান মেজর জিয়াউর রহমানের কাছে। হাত ধরে তাকে রাস্তার ধারে নিয়ে যান। জানান, ক্যাপ্টেন অলি আহমদের কাছ থেকে বার্তা নিয়ে এসেছেন। পশ্চিমারা গোলাগুলি শুরু করেছে। শহরে বহু লোক হতাহত হয়েছে। এতে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন মেজর জিয়াউর রহমান। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দৃঢ়কণ্ঠে তিনি বলে ওঠেন— ‘উই রিভোল্ট।’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি খালেকুজ্জামানকে ষোলশহরে ফিরে গিয়ে ব্যাটালিয়নকে তৈরি করার জন্য কর্নেল অলি আহমদকে নির্দেশ দিতে বলেন। আর সেই সঙ্গে নির্দেশ পাঠান ব্যাটেলিয়নের সমস্ত পশ্চিমা অফিসারকে গ্রেফতারের। এই রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল জানজুয়াসহ সব পশ্চিমা অফিসারকে গ্রেফতার করা হলো।
এরপর অন্যান্য ব্যাটেলিয়নের বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের ফোন করলেন, কিন্তু অনেককেই পেলেন না। এ পর্যায়ে তিনি বেসামরিক বিভাগে টেলিফোন অপারেটরকে ফোন করে ডিসি, এসপি, কমিশনার, ডিআইজি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের জানাতে অনুরোধ করেন যে, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়ন বিদ্রোহ করেছে। টেলিফোন অপারেটর মেজর জিয়ার এ অনুরোধ সানন্দে গ্রহণ করেন।
এ পরিস্থিতিতে মেজর জিয়া অষ্টম ব্যাটেলিয়নের অফিসার, জেসিও জোয়ানদের জড়ো করলেন। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তখন রাত আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিট। তিনি ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। ঘোষণায় বললেন, “আমি মেজর জিয়াউর রহমান প্রভিশনাল প্রেসিডেন্ট ও লিবারেশন আর্মি চিফ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানাচ্ছি। বাংলাদেশ স্বাধীন। আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হলাম। আপনারা যে যা পারেন, সামর্থ্য অনুযায়ী অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। আমাদেরকে লড়াই করতে হবে এবং পাকিস্তানি বাহিনীকে দেশ ছাড়া করতে হবে।”
মেজর জিয়া ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে যান। বেতার কর্মীরা মেজর জিয়াউর রহমানকে পেয়ে উত্ফুল্ল হয়ে ওঠেন। কিন্তু কি বলবেন তিনি? একটি করে বিবৃতি লেখেন আবার তা ছিঁড়ে ফেলেন। এদিকে বেতার কর্মীরা বারবার ঘোষণা করছিলেন যে, আর পনের মিনিটের মধ্যে মেজর জিয়াউর রহমান ভাষণ দেবেন। প্রায় দেড় ঘণ্টায় তিনি তৈরি করেন তাঁর ঐতিহাসিক ঘোষণাটি। সেটা তিনি বাংলা এবং ইংরেজিতে পাঠ করেন। এই ঘোষণা ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ দিল্লির ‘দি স্টেটস্ম্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

আমাদের দেশে বহুল প্রচারিত একটি বিতর্ক আছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা কে করেছেন ? দেশে বড় দুটি দল , একটি বিএনপি অপরটি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বাধীন দল আওয়ামী লীগ । তাদের প্রত্যেকের দাবি তাদের নেতার পক্ষে । এমন একটি বিষয় যা স্বাধীনতার বিশেষ একটি মান মর্যাদার সাথে জড়িত, এমন একটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক করা কখনই উচিত নয় । কিন্তু আমাদের দেশে অনুচিত অনেক কিছু ঘটে যা বিশ্বে আর কোন দেশে ঘটে না । যেমন, স্বাধীনতার মহান নেতাকে গালি দেয়া , দেশ নিয়ে বিতর্ক করা , ইত্যাদি .।এর সাথে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে এই বিতর্ক কোন নূতন ঘটনা নয় । তবে আমাদের এই বিতর্কের ফলে জাতি দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে । এই পিছিয়ে পড়া জাতি কি করে মাথা তুলে দাঁড়াবে যদি কোন একতা না থাকে ?

 জিয়াউর রহমান ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এনিয়ে কোনো বিতর্কের কোন সুযোগ নেই।জিয়াউর রহমান সেদিন সাত কোটি বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের স্বাধীণতার ঘোষনা তৎক্ষালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দেওয়ার কথা থাকলেও তা দিতে তারা ব্যর্থ হয়েছিলেন। এ জন্য ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান এই ঘোষনা দিয়ে জাতিকে মুক্তি সংগ্রামের দিকে দাবিত করেছিলেন। এই ঘোষনা কারো প্রেরিত বার্তা ছিলোনা বরং জিয়াউর রহমানের নিজের লিখা বার্তা ছিলো।
জিয়াউর রহমান রণাঙ্গনে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন এবং জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ থেকে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় মহান বিজয়। বিশ্ব মানচিত্রে ঠাঁই করে নেয় বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান ব্যারাকে ফিরে যান এবং সেনাবাহিনীর নিয়মিত চাকরিতে যোগ দেন। তাঁর ডাকে দেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যদি যুদ্ধে জয়লাভ করত তাহলে জিয়াউর রহমানকে ফাঁসিতে ঝুলতে হতো।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতারের পরমুহুর্তে মেজর জিয়ার দুঃসাহসিক আত্মপ্রকাশ। মেজর জিয়াই মরহুম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করে শেখ মুজিবকে ইতিহাসের মহানায়ক হওয়ার ক্ষেত্র টেকসই করে সম্প্রসারিত করেছেন। আজকাল স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক নিরর্থক এবং নিতান্তই কূট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার মাত্র। মেজর জিয়ার স্বাধীনত